শনিবার, ৬ জুন ২০২৬ | ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

Weekly Bangladesh নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত
নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত

আম উৎপাদনে বিশ্বসেরার কাতারে বাংলাদেশ, রপ্তানি তলানিতে

বাংলাদেশ অনলাইন :   |   শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬

আম উৎপাদনে বিশ্বসেরার কাতারে বাংলাদেশ, রপ্তানি তলানিতে

পাকা আম। ছবি : সংগৃহীত

রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, সাতক্ষীরা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের বৃহৎ আম অর্থনীতি। দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই ফল শুধু কৃষকদের আয়ের উৎসই নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত। এই আম উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে স্থান করে নিলেও আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানিতে দেশ এখনও প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। রপ্তানির পরিমাণের দিক থেকে তলানিতে অবস্থান করছে বাংলাদেশ।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ২ লাখ হেক্টরের বেশি জমিতে বছরে প্রায় ২৬ থেকে ২৮ লাখ মেট্রিক টন আম উৎপাদিত হচ্ছে। এর বড় অংশ আসে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ অঞ্চল থেকে। চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে ২ লাখ ৮৬ হাজার মেট্রিক টন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৪ লাখ ৫৮ হাজার মেট্রিক টন এবং নওগাঁয় ৩ লাখ ৭৮ হাজার মেট্রিক টন আম উৎপাদনের

লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তিন জেলায় মোট ১১ লাখ ২২ হাজার মেট্রিক টন আম উৎপাদনের লক্ষ্য ধরা হয়েছে, যা দেশের মোট উৎপাদনের একটি বড় অংশ।

বর্তমানে দেশের আম বাজার আনুমানিক প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার। উৎপাদন, পরিবহন, পাইকারি ও খুচরা বিপণন, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং মৌসুমি কর্মসংস্থান মিলিয়ে এই খাত গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। রাজশাহী অঞ্চলে আমকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর কয়েক হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বর্তমানে দেশে ১৪টি জেলায় বাণিজ্যিকভাবে আমের ব্যাপক চাষ হচ্ছে। গোপালভোগ, হিমসাগর, খিরসাপাত, ল্যাংড়া, আম্রপালি, ফজলি, হাঁড়িভাঙা ও গৌড়মতিসহ বিভিন্ন জাতের আম দেশীয় বাজারে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমচাষি আব্দুল করিম বলেন, এ বছর গাছে ফলন ভালো হয়েছে। আবহাওয়াও অনুকূলে ছিল। তবে কৃষকরা ন্যায্য দাম পাবেন কিনা, তা অনেকটাই নির্ভর করছে বাজার ও রপ্তানির ওপর। রপ্তানি বাড়লে কৃষকরাও লাভবান হবেন।

বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, আম উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। বর্তমান উৎপাদনের হিসাব বিবেচনায় নিলে দেশটির অবস্থান আরও ওপরে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু উৎপাদনে শীর্ষ তালিকায় থাকলেও রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান খুবই দুর্বল। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ বিশ্বের ২৯টি দেশে মাত্র ২ হাজার ১৯৪ টন আম রপ্তানি করেছে। এর আগের বছর রপ্তানি হয়েছিল ১ হাজার ৩২১ টন এবং ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ১০০ টন। সব মিলিয়ে আম রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১০০ কোটি টাকারও কম, যা দেশের মোট আম বাজারের তুলনায় অত্যন্ত সামান্য।

বর্তমান সময়ে যুক্তরাজ্য, ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি, কানাডা, নেদারল্যান্ডস, কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ ৩৮টি দেশে বাংলাদেশের আম যাচ্ছে। পাশাপাশি চীন, মালয়েশিয়া, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার মতো নতুন বাজারেও আগ্রহ বাড়ছে।

আম রপ্তানিকারক ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের আমের চাহিদা থাকলেও বেশ কিছু কাঠামোগত সমস্যা রপ্তানির পথে বড় বাধা হয়ে রয়েছে।

দেশের অন্যতম কৃষিপণ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ট্রেড লিংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাওসার আহমেদ রুবেল বলেন, বর্তমানে আম রপ্তানির সবচেয়ে বড় বাধা হলো বিমান ভাড়া। যুক্তরাজ্যে প্রতি কেজি আম পাঠাতে শুধু বিমান ভাড়াই গুনতে হচ্ছে ৫০০ টাকার বেশি। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

রপ্তানিকারকদের মতে, বাগান থেকে সংগ্রহ, বাছাই, পরিষ্কার, প্যাকিং ও অভ্যন্তরীণ পরিবহন মিলিয়ে প্রতি কেজি আমের খরচ দাঁড়ায় প্রায় ১৫০ টাকা। এর সঙ্গে বিমান ভাড়া যোগ হলে মোট ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। ফলে ভারত, পাকিস্তান ও থাইল্যান্ডের তুলনায় বাংলাদেশি আমের দাম বেশি পড়ে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন উৎপাদন ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট ও হট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট কেন্দ্র, আধুনিক প্যাক হাউস, গ্রেডিং সুবিধা, অ্যাক্রিডিটেশন ল্যাব, কোল্ড চেইন ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী ব্র্যান্ডিংয়ের অভাবও বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদনের জন্য বাগান নিবন্ধন, উত্তম কৃষি চর্চা (জিএপি), কৃষক প্রশিক্ষণ এবং কন্ট্রাক্ট ফার্মিংয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি রপ্তানিমুখী বাগান গড়ে তোলা এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান বলেন, গত কয়েক বছরে কন্ট্রাক্ট ফার্মিং, নিরাপদ আম উৎপাদন এবং সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী মানসম্মত আম উৎপাদনের সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে উৎপাদন বৃদ্ধির প্রকৃত সুফল পেতে হলে রপ্তানির বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাগুলো দ্রুত দূর করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, আমসহ দেশের কৃষিপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো উচ্চ বিমান ভাড়া এবং পর্যাপ্ত কার্গো স্পেসের অভাব। অনেক সময় রপ্তানিযোগ্য পণ্য প্রস্তুত থাকলেও বিমানে জায়গা না পাওয়ায় নির্ধারিত সময়ে বিদেশে পাঠানো সম্ভব হয় না। এই দুটি সমস্যার কার্যকর সমাধান করা গেলে বাংলাদেশের আম রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন সম্ভব হবে।

আরিফুর রহমান আরও বলেন, গত বছর বাংলাদেশ থেকে ২ হাজার ১৯৪ টন আম রপ্তানি হয়েছে। উৎপাদন ভালো হওয়ায় এবং নতুন বাজারে চাহিদা বাড়তে থাকায় চলতি মৌসুমে রপ্তানির পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পাবে বলে আমরা আশাবাদী।

ঈদের কয়েকদিন আগে চলতি বছরের আম রপ্তানির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পণ্য পাঠাতে প্লেন ভাড়া বেশি গুনতে হয়। বিমান ভাড়া কমানোর প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কার্গো পরিবহন খরচ কমানো ছাড়া রপ্তানিতে বড় অগ্রগতি সম্ভব নয়। এ সমস্যা সমাধানে সরকার কাজ করছে।

এদিকে, কৃষি অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, উৎপাদন সক্ষমতা, বৈচিত্র্যময় জাত, নিরাপদ চাষাবাদ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে বাংলাদেশের আম খাত এখন একটি রূপান্তরের পর্যায়ে রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক প্যাক হাউস, কোল্ড চেইন ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণ, সরাসরি কার্গো ফ্লাইট, উন্নত প্যাকেজিং এবং শক্তিশালী ব্র্যান্ডিং নিশ্চিত করা গেলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই আম দেশের অন্যতম প্রধান কৃষি রপ্তানি পণ্যে পরিণত হতে পারে।

রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে উৎপাদিত সুস্বাদু ও নিরাপদ আম বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের নতুন পরিচয় হয়ে উঠতে পারে। এ জন্য প্রয়োজন কৃষক, গবেষক, সরকারি সংস্থা এবং রপ্তানিকারকদের সমন্বিত উদ্যোগ, আধুনিক অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। এমন উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের আম শিল্প শুধু কৃষকের ভাগ্যই বদলাবে না, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন দিগন্তও উন্মোচন করবে বলে মনে করেন তারা।

Posted ১১:৪৯ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬

Weekly Bangladesh |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

কাঁঠাল সমাচার

(2230 বার পঠিত)

এ বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১৩১৫১৬১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭৩০  
Dr. Mohammed Wazed A Khan, President & Editor
Anwar Hossain Manju, Advisor, Editorial Board
Corporate Office

86-47 164th Street, Suite#BH
Jamaica, New York 11432

Tel: 917-304-3912, 718-523-6299 Fax: 718-206-2579

E-mail: [email protected]

Web: weeklybangladeshusa.com

Facebook: fb/weeklybangladeshusa.com

Mohammed Dinaj Khan,
Vice President
Florida Office

1610 NW 3rd Street
Deerfield Beach, FL 33442

Jackson Heights Office

37-55, 72 Street, Jackson Heights, NY 11372, Tel: 718-255-1158

Published by News Bangladesh Inc.